ইন্টারনেট ব্রাউজ করতে কিভাবে সুরক্ষিত থাকবেন

ইমেইল ফিশিং কি


প্রযুক্তির কল্যানে আধুনিক এই যুগে আমাদের সকলের হাতে হাতে স্মার্টফোন। আর স্মার্টফোন মানেই ইন্টারনেট এর সংযোগ। তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে ইন্টরনেট ব্রাউজ করা তথা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই সুরক্ষিত থাকা উচিত।

ব্রাউজারের নিরাপত্তা কি এবং কেন আমাদের তথ্য সুরক্ষিত করা প্রয়োজন?

ইন্টারনেট ব্যবহারে কিভাবে সুরক্ষিত থাকবেন

সাধারণত আমাদের বেশিরভাগ ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ের জন্য আমরা কোনো না কোনো ব্রাউজার ব্যবহার করা থাকি। ব্রাউজারগুলির মাধ্যমে, আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় অথবা প্রিয় ওয়েবসাইটগুলি অ্যাক্সেস করতে অথবা বন্ধু বা পরিবারের সাথে সংযোগ করতে সক্ষম হয়ে থাকি। করে থাকি নানা ধরণের তথ্যের আদান-প্রদান। সেগুলো হতে পারে পারিবারিক, ব্যবসায়িক বা আর্থিক। আমরা যদি আমাদের ব্যবহৃত ব্রাউজারগুলিতে আদান-প্রদানকৃত তথা ব্যবহৃত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত না করি, তাহলে আমরা নিজেদেরকে Malware এবং Virus কাছে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ এ সকল তথ্য প্রকাশ করার ঝুঁকি নিয়ে থাকি। যা আমাদের এ সকল প্রয়োজনীয় এবং ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করতে পারে।

ইন্টারনেট ব্রাউজ করার সময়ে আপনার ব্যবহৃত ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপদ রাখার প্রধান উপায় হচ্ছে একটি সুরক্ষিত ওয়েব ব্রাউজার ব্যবহার করা। হ্যাকার বা সাইবার অপরাধীদের দ্বারা আপনার ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য ওয়েব ব্রাউজ করার সময় সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাইবার অপরাধীরা সর্বদা ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করার নতুন নতুন উপায় অবলম্বন করে থাকে। সবচেয়ে সাধারণ উপায়গুলির মধ্যে একটি হল ফিশিং স্ক্যামের মাধ্যমে। এই ধরণের স্ক্যামের মাধ্যমে আপনার অনলাইন ব্যাংকিং মতো বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে একদম আসল ইমেলের মতো ছদ্মবেশ ধারণ করা ইমেইল প্রেরণ করে থাকে। অত্যন্ত নিখুত এই মেইলগুলিতে ক্লিক করা মাত্র আপনার ব্যক্তিগত তথ্য মুহুর্তে তাদের হাতে গিয়ে পৌছায়।

তাই ইন্টারনেট ব্রাউজ করার সময় আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকা উচিত।

বিভিন্ন ধরণের ব্রাউজার এবং কোনটি আপনার পছন্দ করা উচিত?

নিরাপদভাবে ইন্টারনেট ব্রাউজ করার একটি ভালো উপায় হলো Incognito mode বা ব্যক্তিগত ব্রাউজিং। এটি ব্রাউজারের একটি বিশেষ সুবিধা, যা আপনাকে আপনার সদ্য ব্রাউজিং করা তথ্য সংরক্ষণ না করেই ইন্টারনেট ব্রাউজ করিয়ে থাকে। ব্রাউজারের এই মোডে ইন্টারনেট ব্যবহার করার ফলে আপনার অনুসন্ধান করা যে কোনও তথ্য, পরিদর্শন করা ওয়েবসাইটসহ প্রদান করা সকল ধরণের তথ্য ব্রাউজারের মেমোরিতে অন্তর্ভূক্ত থাকে না। ফলে ব্যবহৃত তথ্য হারানোর ভয় থাকে না।

কোন ব্রাউজারটি সুরক্ষিত?

প্রচলিত বেশিরভাগ ব্রাউজারই এর ব্যবহারকারীর নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তৈরি করা। এগুলোর এক একটার এক এক ধরণে সুবিধা রয়েছে। এ সকল ব্রাউজার নিজস্ব নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে একজন ব্যবহারকারীকে বিভিন্ন ধরণে Malicious websites এবং অন্যান্য হুমকি থেকে রক্ষা করে থাকে।

বর্তমানে বিনামূল্যে অসংখ্য ওয়েব ব্রাউজার পাওয়া যায়। এসবের প্রায় সবগুলোই নিরাপত্তার দিক থেকে বেশ শক্তিশালী। অল্পকিছু এদিক-সেদিক থাকলেও বর্তমানে সব থেকে জনপ্রিয় ওয়েব ব্রাউজার গুলো হচ্ছে গুগলক্রোম, সাফারি, মাইক্রোসফট এজ, মজিলা ফায়ারফক্স, অপেরা, ব্রেভ ইত্যাদি।

তবে এদের মধ্যে প্রাইভেসি তথা গোপনীয়তার বিষয়ে, একজন ব্যবহারকারীর ডেটা সুরক্ষিত রাখার জন্য Firefox হল সেরা ব্রাউজার। এটি ট্র্যাকিং এবং ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা ও বিভিন্ন ধরণের সাইবার অ্যাটাকের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ মানের সুরক্ষা প্রদান করার চেষ্টা করে।

অনলাইনে কিভাবে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখবেন

এ বিষয়ে নিম্নের কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।

শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

আমরা সাধারণত অনলাইনে বিভিন্ন ধরণের ওয়েব সাইটে নানা ধরণের পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে থাকি। যা অনলাইনে সুরক্ষিত থাকার জন্য একটি প্রধান মাধ্যম। এই পাসওয়ার্ড যদি সহজেই অনুমানযোগ্য বা দুর্বল হয়ে থাকে, তবে অন্য সকল সুরক্ষা অনেকটাই অরক্ষিত হতে পারে। তাই আমাদের অবশ্যই একটি শক্ত পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা উচিত।

  • জটিল পাসওয়ার্ড ব্যবহার: আপনার নাম বা জন্ম তারিখ অথবা মোবাইল নম্বর এগুলোকে পাসওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহারের বদলে কয়েকটি বড় হাতের অক্ষর, ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা এবং বিশেষ কিছু সিম্বল মিশিয়ে কমপক্ষে ১০ অক্ষরের পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন।

  • টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন (2FA) চালু করা:  সুরক্ষার আরও একটা স্তর হচ্ছে এটি। সঠিক পাসওয়ার্ড প্রবেশ করানোর পরও অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আগে থেকে যুক্ত করে নেয়া অথেন্টিকেশন অ্যাপে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জেনারেট হওয়া নির্দিষ্ট কোড বা বায়োমেট্রিক সুরক্ষা (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) চালু করে রাখুন।

ইন্টারনেট ব্রাউজিং বা কোনও কিছু সার্চ করার সময় সতর্কতা

ইন্টারনেটের সেবাদানকারী সব প্রতিষ্ঠান যেমন গুগল বা ফেসবুকের মতো বড় কোম্পানিগুলো একজন ব্যবহারকারীর প্রতিটি ক্লিক ট্র্যাক করে। এ থেকে সুরক্ষিত থাকতে নিম্নের পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন।

  • ইনকগনিটো মোড: এই মোড অ্যাকটিভ করে যেকোনও ব্রাউজারে আপনার ব্যবহার করা যাবতীয় তথ্য ব্রাউজার হিস্ট্রি-তে জমা হওয়া বন্ধ করে থাকে। ফলে ব্রাউজারটি বন্ধ করার সাথে সাথে আপনার ব্যবহৃত তথ্যাদি মুছে যা। যা আপনার ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখতে বেশ কার্যকর।

  • গোপনীয়তা রক্ষাকারী ব্রাউজার: তুলনামূলক ভালোমানের গোপনীয়তা রক্ষাকারী ওয়েব ব্রাউজার ব্যবহার করুন। যেমন Brave বা Firefox ব্যবহার করলে এটি ট্র্যাকার ব্লক করার সুবিধা দিয়ে থাকে।

  • সার্চ ইঞ্জিন: কিছু কিছু সার্চ ইঞ্জিন রয়েছে যেগুলো ব্যবহারকারীর অনুসন্ধানকরা তথ্য সংরক্ষণ করে না। যেমন DuckDuckGo চাইলে এটি ব্যবহার করতে পারেন। 

সামাজিক মাধ্যমে তথ্যের নিয়ন্ত্রণ

আজকের এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আমরা আমাদের অজান্তেই প্রচুর ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করে ফেলি। যা পরবর্তীতে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহার করার সুযোগ করে দেয়।

  • প্রাইভেসি সেটিংস চেক করুন: আপনার ব্যবহৃত সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে আপনার দেয়া পোস্ট এবং প্রোফাইল যেন শুধু আপনার পরিচিত 'Friends' দেখতে পারে সেটা নিশ্চিত করা উচিত।

  • প্রয়োজনীয় তথ্য শেয়ার না করা: এতে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য যেমন ফোন নম্বর, বাসার ঠিকানা বা বর্তমান লোকেশন যার-তার সাথে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

  • অপরিচিত অ্যাপের পারমিশন: আমাদের ব্যবহৃত স্মার্টফোনে বিভিন্ন ধরণের অ্যাপ ইন্সটলের সময় দেখে-শুনে করা উচিত। ফেসবুকে বা গুগলে বিভিন্ন গেম বা কুইজ অ্যাপকে আপনার প্রোফাইল অ্যাক্সেস করতে দেবেন না।

পাবলিক ওয়াই-ফাই ও ভিপিএন (VPN)

ক্যাফে বা এয়ারপোর্টের ফ্রি wi-fi ব্যবহার করা ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার জন্য বড় ঝুঁকি।

  • পাবলিক নেটওয়ার্ক এড়িয়ে চলুন: অনলাইনে লেনদেন বা প্রয়োজনীয় কোনও অ্যাপ এ লগইন করার সময় মোবাইল ডেটা ব্যবহার করা তুলনামূলক নিরাপদ। তাই ফ্রি হলেও পাবলিক নেটওয়ার্ক এড়িয়ে চলুন।

  • ভিপিএন ব্যবহার: যদি একান্ত পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহার করতেই হয়, তবে একটি ভালো মানের VPN (যেমন: ProtonVPN বা NordVPN) ব্যবহার করুন। এটি আপনার ব্যবহৃত তথ্য ইন্টারনেটে গোপন করে রাখে।

ইমেইল ও ফিশিং থেকে সাবধান

ইন্টারনেটে ওৎপেতে বসে থাকা হ্যাকাররা অনেক সময় ব্যাংক বা পরিচিত কোম্পানির নাম বা লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ইমেইল পাঠিয়ে পাসওয়ার্ডসহ বিভিন্ন ধরণের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে। এ থেকে রক্ষা পেতে আপনাকে অবশ্যই কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে।

ইমেইল ফিশিং কি
Designed by Freepik

  • সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক করবেন না: আপনার ইমেইলে প্রাপ্ত যে কোনও ধরণের পুরস্কারের লোভ দেখালে বা আপনার কোনও অ্যাকাউন্টের সমস্যার তথ্য সম্বলিত লিংক এ ক্লিক করার আগে সতর্ক থাকুন। একান্ত বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা পক্ষ হতে প্রাপ্ত লিংক ব্যতিত যেন-তেন লিংক এ ক্লিক করা থেকে দূরে থাকুন।

  • অস্থায়ী ইমেইল: স্বল্প সময়ের জন্য বা অস্থায়ী সাধারণ কোনও ওয়েবসাইট বা ব্লগে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য আপনার মূল ইমেইল না ব্যবহার করে Temp Mail ব্যবহার করতে পারেন। এতে অনলাইন জগতে আপনি অনেকটা নিরাপদ থাকবেন।

অনলাইনে এখনই আপনার সুরক্ষা নিশ্চিত করুন!

দিন দিন ইন্টারনেট ব্যবহার যেমন নানাবিধ সুবিধা নিয়ে আসছে। আবার তেমনই ঝুঁকিপূর্ণও হচ্ছে।দৈনিক আমাদের ইন্টারনেট ব্যবহারে আরও অধিকতর সতর্ক হতে হবে। দিনে দিনে আমাদের আর্থিক, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, ব্যবসায়িক সকল ধরণের কার্যক্রম যেহেতু ইন্টারনেট ভিত্তিক হয়েই চলেছে, সেহেতু অনলাইনে এই ঝুঁকিগুলির কথা মাথায় রেখে আমাদের আরও সতর্ক থাকতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যে ইন্টারনেট ব্যবহারে আপনি সুরক্ষিত।

তাই আপনার ব্যবহার বিধি অনলাইনে সুরক্ষিত নিশ্চিত করুন আপনি নিজেই এবং আগামীর নিরাপদ জীবন যাপন করুন।

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url